স্বাধীনতার সুখ ও আমার জুলাই স্মৃতিকথা

সম্পাদকীয় ডেস্ক
2
জুলাই স্মৃতিকথা | জ্ঞানচক্র
ছবি : স্বাধীনতার প্রতীকী চিত্র (এআই দ্বারা নির্মিত)।
📌 সংক্ষেপে

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা —প্রাইম মেডিকেল কলেজ, রংপুরের মিছিল থেকে শুরু করে আবু সাঈদের শাহাদাত, ইন্টারনেট বন্ধের সময় আন্দোলনের খবর সংগ্রহ ও ছড়িয়ে দেওয়া, গ্রেপ্তারের আতঙ্ক, ১ দফা আন্দোলনে অংশগ্রহণ এবং ৪ আগস্ট কুড়িগ্রামের রাজপথে সংঘর্ষ ও আহতদের চিকিৎসাসেবায় যুক্ত হওয়ার প্রত্যক্ষ স্মৃতিচারণ এই লেখায় উঠে এসেছে। লেখক মো. সাব্বির সাদিক বর্ণনা করেছেন কীভাবে ১৬ জুলাই রংপুরে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের প্রথম কোটাবিরোধী মিছিলের অংশ হওয়া থেকে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিজয় উদযাপন পর্যন্ত তাঁর জুলাইয়ের দিনগুলো কেটেছে। আন্দোলনের ভয়, প্রতিরোধ, মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা, আহতদের সেবা এবং ৫ আগস্টের বিজয়ের আনন্দ—সব মিলিয়ে এটি ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একজন প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীর ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ।

আমার জুলাই অফিশিয়ালি শুরু হয়েছিল ১৫ তারিখ রাত থেকে। কোটা আন্দোলন নিয়ে প্রথম থেকে সরব থাকলেও সশরীরে এই আন্দোলনে যুক্ত হই ১৫ জুলাই রাতে। কোটা আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের উপর অমানবিক হামলার প্রতিবাদে ১৫ তারিখ রাতে হোস্টেলে সব ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত হয় আগামীকাল আমরা ক্লাস বর্জন করে মিছিল বের করবো। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্দোলনে সরব হলেও মেডিকেল কলেজগুলো এক ধরনের শীতনিদ্রায় ছিল। তখন পর্যন্ত আমরা দেশের কোনো মেডিকেল কলেজের আন্দোলনের খবর পাই নি।


পরের দিন ১৬ই জুলাই আমাদের প্রাইম মেডিকেল কলেজে গত রাতের পরিকল্পনা অনুযায়ী সকাল ৯:৩০ মিনিটে মিছিল বের করার প্রস্তুতি নিতে থাকি। দুঃখজনক বিষয় ছিলো, স্টুডেন্টদের উপস্থিতি ছিল একদম নগণ্য। তার মধ্যে কলেজের কিছু আওয়ামী চেতনাধারী সিনিয়র গত রাতেই বিভিন্ন জুনিয়রকে মিছিলে যুক্ত না হওয়ার জন্য হুমকি-ধামকি দেয়। ফলে স্টুডেন্টদের উপস্থিতি সন্তোষজনক হয় না। এছাড়াও কলেজের বিভিন্ন মহলের অসহযোগিতা তো চলছিলই। সবকিছু উপেক্ষা করে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মাঝেই আমরা কিছু শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে যাই কলেজের লবি তে। যথারীতি ব্যানারহীন মিছিল বের হয়। অনেকে ইন্সট্যান্ট কিছু প্লাকার্ড বানিয়ে মিছিলে যুক্ত হয়। অবশেষে সকাল ১০ টায় মিছিল বের হয়ে ১১:৩০ পর্যন্ত মিছিল চলে। রংপুরে এটাই ছিল কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোটাবিরোধী প্রথম মিছিল।


এরপর ধারাবাহিকভাবে ১১:৩০ এ রংপুর মেডিকেল কলেজে এবং তার পরপরই কারমাইকেল কলেজের মিছিল বের হয়ে যায়। বেলা ৩:০০ টায় মিছিল বের হয় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সেই মিছিলেই পুলিশ গুলি চালায়, আর সেদিনই বিকেল ৩:৩০ এ জুলাই এর প্রথম শহীদ আবু সাঈদ রাজপথে রক্ত ঢেলে ইতিহাসের মোড় ঘুড়িয়ে দেন।


সেদিনের পরেই কলেজে ক্লাস অফ হয়ে যায়। আমি বাড়ি চলে আসি। বাড়িতে এসে যথারীতি অনলাইন-অফলাইনে সমান তালে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বাড়ির আশপাশের সমাবেশ মিছিলে যুক্ত হতে থাকি।

ইন্টারনেট অফ থাকার সময়গুলো বন্ধুদের সাথে ফোনকলে, মেসেজে কথাবার্তা হতো। বিভিন্ন এলাকার খোজ নেয়া হতো। আন্দোলনে সক্রিয় ছাত্রদের গ্রেফতারের খবর আসতো। পাশাপাশি আওয়ামী মতের ভিন্নমত লালনকারীদেরও গ্রেফতারের খবর পাই, যেহেতু আওয়ামী ন্যারেটিভ ছিল দাড়ি-টুপি পড়লেই 'জঙ্গী'  ইসলামী বই পড়লে 'জঙ্গী'।

প্রাকটিসিং মুসলিম হলেই জঙ্গী তকমা ফ্যাসিস্টের আমলে ডালভাত ব্যাপার ছিল। এজন্য আমি বাড়ির সব ইসলামী বই  পাশের মসজিদে রেখে আসি। সম্ভবত তখন রাত ১১ টার কাছাকাছি সময় ছিল। বাড়িতে মসজিদের চাবি থাকায় বইগুলো রেখে আসা গেছে। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায়, গ্রেফতারের ভয়টা তখন এতই প্রবল ছিল; যেকারণে এত রাতে আমাকে বই রাখতে মসজিদ যেতে হয়েছে। বইগুলো রাখার কারণ ছিল, গ্রেফতার হলেও যেন আওয়ামীলীগের পোষা পুলিশ বাহিনী জঙ্গী ট্যাগ দিতে না পারে।


যাহোক এভাবেই চলছিল সময়। ভিপিএন দিয়ে নেট চালাতাম আর যা ইনফরমেশন পেতাম, সেসব ইনফরমেশন বিভিন্ন গ্রুপে শেয়ার দিতাম, পোস্ট করতাম।


লেখক। ৪ আগস্ট, ২০২৪


এরপর একদিন(সম্ভবত জুলাইয়ের ৩০ তারিখ) আমি আব্বুকে কিছু আইনজীবীর নাম্বার দেই। যারা সেসময় গ্রেফতার হওয়া ছাত্রদের সহায়তায় কাজ করতো। এছাড়াও কিছু বন্ধুর নাম্বার দেই, যাতে আমি গ্রেফতার হলে যোগাযোগ করা যেতে পারে। এতে বাড়িতে সবাই ভয় পেয়ে যায়। যাহোক, তারপর কয়েকদিন আমি টোটালি নেটওয়ার্কের বাইরে চলে যাই। ভিপিএনের অবস্থাও বাজে লেভেলে চলে যায়। আমি সারাদিন আমার বাগানে গাছের পরিচর্যা করতাম, বই পড়তাম। মায়ের সাথে, ছোটোবোনের সাথে গল্প করে কাটাতাম। এছাড়া আর কোনো কাজ ছিল না।


এরই মাঝে আসিফ মাহতাব উৎস স্যার, ফাহাদ স্যার গ্রেফতার হলে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে ফেটে পড়ে আরো বেশি। স্কুল লেভেলে আন্দোলন শুরু হয়। কুড়িগ্রামেও আন্দোলন হয় স্যারদের মুক্তির বিষয়ে। আমরাও যুক্ত হই সেখানে।


এসবের মধ্যেই নাহিদ ইসলাম ১ দফার ঘোষণা দিয়ে ফেলে।


হুট করে আগষ্টের ৩ তারিখ রাতে আমার ইন্টারমিডিয়েটের সময় আমাকে ক্যামিস্ট্রি পড়ানো ম্যাম, আয়শা আপু আমাকে ইনবক্সে মেসেজ দেয়। জানায় আগামীকাল কুড়িগ্রামে হাসিনার পদত্যাগ চেয়ে আন্দোলন হবে। আমাকে সেখানে উপস্থিত থাকতে বলেন। সত্যি বলতে অনলাইন থেকে দুয়েকদিন দূরে থাকতেই আমি নিজ জেলার খবরও জানতাম না। 

৪ তারিখে পুরো দেশের ছাত্রসমাজ কর্তৃক ঘোষিত ১ দফা বাস্তবায়নে আন্দোলনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকি সকালে। আম্মুকে জানাই যে আমি আন্দোলনে যাবো। আম্মু বারণ করে। তারপরও আম্মুকে কোনোরকমে বোঝাতে সক্ষম হই। আম্মু ৩৭০ টাকা হাতে দেয়। আর আমাকে নাশতা করতে বলে।  আন্দোলনে কেউ না খেয়ে আসলে তাকেও খাওয়াইতে বলে। 

তো ৪ তারিখে সকাল ১০:৩০ এ প্রেস ক্লাবে সব শিক্ষার্থীর জড়ো হওয়ার কথা থাকলেও ছাত্রলীগের ছেলেরা আগেই প্রেস ক্লাব দখল করে শো ডাউন দেয়। 


আন্দোলনের স্থান পণ্ড হওয়ায় আমি বাড়ি ফিরতে হাটতে থাকি। পথিমধ্যে আমার বন্ধু ফাহিমের সাথে দেখা হয়। কিছুক্ষণ পর জানতে পারি, শিক্ষার্থীরা প্রেস ক্লাবের পরিবর্তে দাদামোড়ে জড়ো হওয়া শুরু করেছে। এটা শুনে আমি, ফাহিম-সহ দাদামোড়ে এসে আন্দোলনে যোগ দেই। এলাকার পরিচিত অনেক ভাই-বেরাদারের সাথে দেখা হয়ে যায় সেখানে।  একসময় ধাওয়া-পালটা ধাওয়া হয় ছাত্রলীগের ছেলেদের সাথে। তারপর একবার ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের ধাওয়া খেয়ে এক বিল্ডিংয়ের ৩ তলায় উঠে পড়ি। আবার নেমে গিয়ে ২ বার ধাওয়া দেই আমরা। তারপর আবার ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা রামদা, চাপাতি নিয়ে ধাওয়া দিলে আমি বৈশ্য পাড়ায় এক বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেই।  সাথে ছিল ছোটভাই হামীম হাদি। কিছু সময় পার হওয়ার পর আব্বু আমাকে ফোন দেয়। আব্বুকে ফোনে জানাই যে আমি একটা কাজে বাজারে আসছি। কিছুক্ষণ পর বাড়ি যাবো। আব্বুকে মিথ্যা জানাই।


৫ই আগস্ট, ২০২৪ । বন্ধুদের সাথে বিজয় উদযাপনে লেখক(মাঝখানে)।


প্রায় আধ-ঘন্টাখানেক সময় সেই বাড়িতে আশ্র‍য় নিতে হয়েছিল। কারণ বাইরে তখন ছাত্রলীগ, যুবলীগের লাগাতার ধাওয়া-পালটা ধাওয়া চলছিল। কিছুক্ষণ পর  শাবাবকে ফোন দিয়ে ওর বাড়িতে যাই। যেহেতু ওর বাড়ি পাশেই ছিলো। এর মাঝে রাসূকে হেটে আসতে দেখি। টিয়ারশেলের ধোয়ায় রাসূর চোখ জ্বালাপোড়া করছিল। দেখতে অসুবিধা হচ্ছিল। পরে ওকে নিয়ে গিয়ে রাস্তায় কাগজ-প্লাস্টিকে আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়া দেই চোখে। এরপর আবার আমি শাবাবের বাড়ির সামনে যাই। তারপর একজন এসে জানায় পাশের বাড়িতে একজন লোক অসুস্থ হয়ে গেছে আন্দোলনে ছাত্রলীগের ছেলেদের আক্রমনে। আমি-শাবাব গিয়ে ওনাকে ব্যান্ডেজ করে দেই। আঘাতে উঠে যাওয়া পায়ের নখ তুলে ফেলে দিয়ে ডেটল দিয়ে দেই একজনকে। একজন মেডিকেল স্টুডেন্ট হিসেবে সেদিন গর্ববোধ করেছিলাম, জুলাই আহতকে সেবা দিতে পেরে।

এভাবেই সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে যায়। আর অল্প সময় পর আওয়ামী সন্ত্রাসীদেরকে বেধরক পিটিয়ে কুড়িগ্রামের আপামর জনতা কুড়িগ্রামকে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের থেকে মুক্ত করে।


এরপর বাড়ি চলে আসি। যথারীতি খোজ খবর রাখতে থাকি। পরেরদিন ৫ তারিখ ছাদে প্রতিদিনের নিয়ম অনুযায়ী আমার বনসাই গাছগুলো প্রুনিং করছিলাম, তখন আম্মু ফোন নিয়ে ছাদে এসে জানায় হাসিনা পালিয়েছে!

তৎক্ষনাৎ কলেজ মোড়ের উদ্দেশ্যে রওনা হই। আনন্দমিছিল বের হয়। রাস্তাঘাটে মানুষ মিষ্টি বিতরণে ব্যস্ত ছিল। সারা রাস্তায় মিষ্টি খেতে খেতে কলেজ মোড়ে গিয়ে মিছিলে যুক্ত হই।


স্বাধীনতার সুখ অন্যরকম। আল্লাহ আমাদের সবাইকে কবুল করুন। আমিন।



লেখা: মো: সাব্বির সাদিক,

প্রাইম মেডিকেল কলেজ, রংপুর। 

০১-০৮-২০২৫

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ

  1. উত্তরগুলি
    1. আপনার উৎসাহমূলক মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ ও জাঝাকাল্লাহ। নিয়মিত এ ধরণের লেখনী পড়তে ও লিখতে জ্ঞানচক্র-এর সাথেই থাকুন।

      মুছুন
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
3/related/default