ইতিহাসে ৩৬ জুলাই: কী, কেন ও কীভাবে আমাদের হলো?

সম্পাদকীয় ডেস্ক
0
36-july-2024-history
ছবি : জুলাই-এর প্রতীকী চিত্র (এআই দ্বারা নির্মিত)।
📌 সংক্ষেপে

৩৬ জুলাই কী? ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠা একটি ঐতিহাসিক গণআন্দোলন, যা ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে নতুন পরিণতি পায়। বাংলা ব্লকেড, ১৪ জুলাইয়ের ‘রাজাকার’ স্লোগান, ১৫ জুলাইয়ের হামলা, ১৬ জুলাই আবু সাঈদের মৃত্যু, মীর মুগ্ধের আত্মত্যাগ, ইন্টারনেট বন্ধ, কারফিউ, আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়ন, এক দফা দাবি এবং শেষ পর্যন্ত ‘লং মার্চ টু ঢাকা’—এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে কোটা আন্দোলন রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানে। তাই ৫ আগস্টকে প্রতীকীভাবে ‘৩৬ জুলাই’ বলা হয়—ক্যালেন্ডারে যার অস্তিত্ব নেই, কিন্তু ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস ও মানুষের স্মৃতিতে যার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।

ক্যালেন্ডারে জুলাই মাসের দিন মাত্র একত্রিশটি। কিন্তু ইতিহাসের কিছু কিছু জুলাই কোনো ক্যালেন্ডার মানে না। তারা শেষ হয় না নির্ধারিত দিনে; রক্ত, অশ্রু আর মানুষের প্রতিরোধের ভেতর দিয়ে আরও কয়েক দিন বেঁচে থাকে।


২০২৪-এর জুলাই তেমনই এক জুলাই। যে জুলাই ৩১ তারিখে শেষ হয়নি, পেরিয়ে গেছে আগস্টের ৫ তারিখ পর্যন্ত। তাই ৫ আগস্ট কেবল ৫ আগস্ট নয়; মানুষের স্মৃতিতে সে ৩৬ জুলাই।


এই ৩৬ জুলাইয়ের জন্ম কিন্তু এক দিনে নয়। জন্ম হয়েছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে কয়েকজন শিক্ষার্থীর কণ্ঠে। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন প্রথমদিকে ছিল শান্ত, সুশৃঙ্খল এবং সুনির্দিষ্ট। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া, আন্দোলনের চরিত্রও বদলে দিতে থাকে।


দাবি ছিল কোটা সংস্কারের। তারপর রাজপথে এলো বাংলা ব্লকেড। সড়ক, মহাসড়ক, মোড়, রেলপথ অবরুদ্ধ হতে থাকল নগরীর স্বাভাবিক গতি। শিক্ষার্থীরা বুঝিয়ে দিল, তাদের দাবি উপেক্ষা করে স্বাভাবিকতার অভিনয় চালিয়ে যাওয়া সহজ হবে না।


এরপর এলো ১৪ জুলাই।

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে উচ্চারিত একটি শব্দ "রাজাকার" জ্বলন্ত আগুনে যেন ঘি ঢেলে দিল। যে শব্দ বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক, সেই শব্দ যখন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ব্যবহৃত হলো বলে তারা মনে করল, তখন রাতের অন্ধকারেই হল থেকে হল, ক্যাম্পাস থেকে ক্যাম্পাসে বেরিয়ে এলো ক্ষুব্ধ তরুণেরা।


স্লোগান উঠল;

"তুমি কে? আমি কে?

রাজাকার, রাজাকার।

কে বলেছে? কে বলেছে?

স্বৈরাচার, স্বৈরাচার"।


সেদিন থেকে আন্দোলনের ভাষা বদলাতে শুরু করল।

তারপর ১৫ জুলাই।

রাজপথে ছাত্রদের ওপর পুলিশ ও গুন্ডা লীগের হামলা , লাঠি, রড, অস্ত্র, হেলমেট সব মিলিয়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ল। ছাত্রলীগের হেলমেটধারী কর্মীদের হামলার দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস আর নিরাপদ রইল না।


আর পরদিন; ১৬ জুলাই।

রংপুরের 'বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়'-এর সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন আবু সাঈদ! দুই হাত প্রসারিত সামনে পুলিশ! হাতে কোনো অস্ত্র নেই! চোখে কোনো ভয় নেই! তারপর গুলি! আবু সাঈদ মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। সেদিন শুধু একজন তরুণ মারা যাননি; বাংলাদেশের বিবেকের সামনে একটি দৃশ্য স্থির হয়ে গেল দুই হাত প্রসারিত এক নিরস্ত্র তরুণ আর তার দিকে ছুটে আসা গুলি। আবু সাঈদের রক্ত আন্দোলনের গতিপথ বদলে দিল। যে আন্দোলন ছিল কোটা সংস্কারের, তা হয়ে উঠল ন্যায়বিচারের আন্দোলন।

আবু সাইদ, রংপুর
ছবি : আবু সাঈদের সেই ইতিহাস সৃষ্টি করা দৃশ্য। ক্রেডিট : বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।


তারপর ১৭, ১৮ জুলাই।

দেশজুড়ে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ, মৃত্যু। ইন্টারনেট বন্ধ। দেশ বিচ্ছিন্ন। তথ্যের পথ রুদ্ধ। তৎকালীন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বক্তব্য ও ভূমিকা নিয়ে তখন দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ইন্টারনেট বন্ধ করা গেলেও মানুষের ক্ষোভ বন্ধ করা গেল না।


আর সেই অন্ধকারের মধ্যেই আরেকটি নাম ইতিহাসে লেখা হলো; মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। যে তরুণ আন্দোলনকারীদের হাতে পানি তুলে দিয়েছিলেন, বিস্কুট দিয়েছিলেন, তৃষ্ণার্ত মানুষকে বলেছিলেন;

"পানি লাগবে পানি"!


সেই মুগ্ধই গুলিতে প্রাণ হারালেন।


একজনের হাতে ছিল প্রতিবাদের পতাকা, অন্যজনের হাতে ছিল পানি। দুজনেই আর ফিরলেন না।জুলাই তখন আর আন্দোলনের গল্প নয়, জুলাই হয়ে গেল শহীদের উপাখ্যান।


এরপর এল কারফিউ।

রাজপথে নামল বিজিবি। নামল সেনাবাহিনী। দেশের বহু স্থানে ছড়িয়ে পড়ল আতঙ্ক। গুলি, গ্রেপ্তার, সংঘর্ষ, মৃত্যু সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ যেন এক অদৃশ্য যুদ্ধের ভেতর ঢুকে গেল। রাষ্ট্র যত কঠোর হলো, মানুষের ক্ষোভও তত গভীর হলো।


এরই মধ্যে আন্দোলনের সমন্বয়কদের আটক করা হলো। একে একে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হলো নাহিদ, আসিফ, আবু বাকের, সারজিস, হাসনাত ও নুসরাত তাবাসসুমকে। আন্দোলন প্রত্যাহারে চাপ সৃষ্টি ও তাদের ওপর নানা ধরনের চাপ প্রয়োগের অভিযোগও সামনে এলো। কিন্তু যে আন্দোলনে আবু সাঈদের রক্ত মিশে গেছে, মুগ্ধের শেষ আহ্বান মিশে গেছে, যে আন্দোলন ইতোমধ্যে অগণিত মানুষের ক্ষত ও কান্না নিজের ভেতর ধারণ করেছে, তাকে কি কয়েকজন সমন্বয়ককে আটকে রেখে থামানো যায়?


জুলাই তখন নিজের পথ নিজেই খুঁজে নিয়েছে। সরকারি শোক ঘোষণা করা হল। খুনি হাসিনা কালো শাড়িতে শোক প্রকাশের অভিনয় করলেন। কিন্তু মানুষের মনে প্রশ্ন জাগল, যে সন্তানদের রক্তে রাজপথ লাল হলো, তাদের হত্যার বিচার না করে কেবল শোকের আনুষ্ঠানিকতা কি সেই ক্ষত মুছে দিতে পারে?


তখন ছাত্রজনতা বেছে নিল অনন্য এক প্রতিবাদী ভাষা। লাল প্রোফাইল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষের প্রোফাইল লাল হয়ে উঠল। রাষ্ট্র বলল শোক। জনতা বলল এই লাল কেবল শোকের নয়, এই লাল রক্তের।

মীর মুগ্ধ
ছবি : পানি বিতরণে মীর মুগ্ধ। গুলি লাগার কিছুক্ষণ আগের।


এদিকে আন্দোলনের চরিত্র ক্রমেই বদলে যাচ্ছিল। কোটা সংস্কারের দাবি তখন পেছনে পড়ে গেছে। শহীদের রক্ত নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিচারের দাবি তৈরি করেছে। জবাবদিহির দাবি তৈরি করেছে।


আর অবশেষে; বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের 'এক দফা'। 

৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে নাহিদ ইসলাম ঘোষণা করলেন এক দফা; শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগ। যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল কোটা সংস্কারের দাবিতে, সেটি তখন এসে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে।


তারপর ৪ আগস্ট।

রক্তাক্ত বাংলাদেশ। সংঘর্ষ, গুলি, মৃত্যু; দিনটি হয়ে উঠল জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে ভয়াবহ দিনগুলোর একটি। একদিকে কারফিউ, অন্যদিকে রাজপথে মানুষের ঢল।


তবুও সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। 'লং মার্চ টু ঢাকা'। প্রথমে ঘোষণা ছিল পরশু। তারপর সময়ের গতি পাল্টে গেল।

সময়ের দাবি বুঝে আসিফ মাহমুদদের সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। পরশু নয়; আগামীকালই 'লং মার্চ টু ঢাকা'।


৫ আগস্ট।

সেদিন আর অপেক্ষা করা যাবে না। এটি কেবল একটি কর্মসূচির তারিখ এগিয়ে আনা ছিল না। এ যেন ছিল একটি প্রজন্মের বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত।


আজই শেষ করতে হবে। ৫ আগস্ট সকাল।

কারফিউ ছিল। ভয় ছিল। গুলি চলার আশঙ্কা ছিল। তবু মানুষ বেরিয়ে এলো। একজন, দুজন, দশজন নয়, ঢাকার পথে পথে নামল জনস্রোত।


যে তরুণ কয়েকদিন আগে পুলিশের সামনে দুই হাত মেলে দাঁড়িয়েছিল, তার স্মৃতি মানুষের বুকের ভেতর।

যে মুগ্ধ শেষবারের মতো তৃষ্ণার্ত মানুষের হাতে পানি তুলে দিয়েছিল, তার স্মৃতি মানুষের বুকের ভেতর।

যে মা সন্তান হারিয়েছেন, তার কান্না মানুষের বুকের ভেতর। জুলাইয়ের প্রতিটি গুলি, প্রতিটি লাশ, প্রতিটি রক্তাক্ত রাজপথ সবকিছু যেন সেদিন মানুষের পদযাত্রার সঙ্গে ঢাকার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।

তারপর এলো সেই মুহূর্ত।

খুনি হাসিনা পদত্যাগ করলেন। দীর্ঘ এক স্বৈরশাসনের অবসান হলো। গণভবনের দরজা খুলে গেল। মানুষ ঢুকে পড়ল ক্ষমতার সেই প্রতীকী দুর্গে।


বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কলঙ্ক-অধ্যায়ের শেষ হলো।


আর তাই, '৫ আগস্ট' কেবল ৫ আগস্ট নয়। এটি ৩৬ জুলাই।


যে জুলাই শুরু হয়েছিল কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে,

বাংলা ব্লকেড পেরিয়েছে। 'রাজাকার' শব্দের প্রতিবাদে উত্তাল হয়েছে। হেলমেট বাহিনীর হামলা দেখেছে। আবু সাঈদের বুকের রক্ত দেখেছে, মুগ্ধের হাতে পানি দেখেছে। ইন্টারনেটের অন্ধকার দেখেছে। কারফিউ দেখেছে। বিজিবি-সেনা মোতায়েন দেখেছে। লাল প্রোফাইলের নীরব প্রতিবাদ দেখেছে। এক দফার জন্ম দেখেছে। আর শেষ পর্যন্ত লং মার্চ টু ঢাকার মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পতন দেখেছে।

গণভবন ৫ই আগস্ট, ২০২৪
ছবি : ৩৬ জুলাই তথা ৫ই আগস্ট-এর ছাত্র-জনতার গণভবন দখল করার সেই ঐতিহাসিক দৃশ্য! 


৩৬ জুলাই তাই শুধু একটি বিজয়ের দিন নয়।

এটি ইতিহাস জন্মের দিন। এটি স্মরণের দিন। এটি আত্মত্যাগের প্রতিদান পাওয়ার দিন। এটি একটি প্রজন্মের জেগে ওঠার দিন।


ইতিহাসের কাছে 'আবু সাঈদ' কেবল একটি নাম নয়। 'মুগ্ধ' কেবল একটি নাম নয়। তারা জুলাইয়ের প্রতীক।


তাদের রক্ত আমাদের মনে করিয়ে দেয়; ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, ভয় চিরস্থায়ী নয়, অন্যায়ও চিরস্থায়ী নয়। চিরস্থায়ী হয়ে থাকে মানুষের আকাঙ্ক্ষা। চিরস্থায়ী হয়ে থাকে স্বাধীনতার স্বপ্ন। চিরস্থায়ী হয়ে থাকে শহীদের রক্তের স্মৃতি।


ক্যালেন্ডারে আজ ৫ আগস্ট। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় আজ '৩৬ জুলাই'।


আজ একটি অসমাপ্ত জুলাইয়ের শেষ দিন। একটি রক্তাক্ত অধ্যায়ের স্মারক। একটি প্রজন্মের জেগে ওঠার প্রতীক।


৩৬ জুলাই; যে তারিখ ক্যালেন্ডারে নেই, কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল থাকবে।



লেখা : মাহমুদ কাসিম

জামেয়া দারুল মা'আরিফ আল ইসলামিয়া, চট্টগ্রাম।

০৬-০৮-২০২৬

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default